গাজীপুরের টঙ্গীর ঐতিহ্যবাহী সাতাইশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাইরে কোচিং পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হেনস্তা ও মব তৈরির চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত সাতাইশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে এলাকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তবে সম্প্রতি বিদ্যালয়টিকে ঘিরে অর্থের বিনিময়ে কোচিং পরিচালনার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয় শুরু হওয়ার আগে সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত এবং স্কুল ছুটির পর বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিদ্যালয় ভবনের ভেতরে শিক্ষার্থীদের আলাদা কোচিং করানো হয়।
উল্লেখ্য, গত ১০ মার্চ ২০২৫ তারিখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই প্রজ্ঞাপনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান শেষে স্কুল ভবনে কোনো ধরনের কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানো নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওই নির্দেশনা উপেক্ষা করে সাতাইশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক নিজাম উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে সহকারী শিক্ষক মিজানুর রহমান মিজান, সহকারী শিক্ষক মো. কাউসার এবং সহকারী শিক্ষিকা মাহমুদা আক্তার পিংকি বিদ্যালয় শুরু হওয়ার আগে ও ছুটির পর কোচিং পরিচালনা করে আসছেন।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোচিংয়ের জন্য জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে নেওয়া হয়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে টানা দুই দিন সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা হয়। দ্বিতীয় দিন স্কুল ছুটির পর বিদ্যালয়ের ভেতরে আলাদা ক্লাস পরিচালিত হতে দেখা যায়। এ সময় কোচিং চলাকালে সহকারী শিক্ষক মিজানুর রহমান মিজান ও মো. কাউসারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, স্কুল ছুটির পর কী ধরনের ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে দায়িত্বরত শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, সামনে বৃত্তি পরীক্ষা থাকায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। তবে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তারা অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, শিক্ষা অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে টঙ্গী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাহিদ পারভীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে বিদ্যালয় শুরু হওয়ার আগে বা ছুটির পর বিদ্যালয়ের ভবনে কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর কোনো অনুমতি নেই। অর্থের বিনিময়ে এমন কার্যক্রম পরিচালনারও কোনো বিধান নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
কোচিং চলাকালে বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে সহকারী শিক্ষক মিজানুর রহমান মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণ করেন এবং উপস্থিত অভিভাবকদের কথা না বলার ইঙ্গিত দেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ে কোচিংয়ের নামে অর্থ নেওয়া হলে সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ানোর মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে টানা দুই দিন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও স্কুল চলাকালে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান এবং প্রমাণ থাকলে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।
ওই ফোনালাপের কিছুক্ষণ পর প্রধান শিক্ষকের পক্ষ থেকে একাধিক ব্যক্তি অনুসন্ধানী টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগের বিষয়বস্তু এবং অনুসন্ধানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চান।
পরদিন পুনরায় প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সাংবাদিকরা বিদ্যালয়ে গেলে প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনও তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি। সহকর্মীরা জানান, তিনি জরুরি কাজে বাইরে গেছেন। পরে প্রধান শিক্ষকের অফিস কক্ষের সামনে থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানতে চান অভিযোগের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না।
জবাবে সাংবাদিকরা জানায়, শিক্ষার্থীদের বক্তব্য এবং ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। এ সময় প্রধান শিক্ষক প্রথমে বিদ্যালয় শুরু হওয়ার আগে ও পরে অতিরিক্ত ক্লাস পরিচালনার বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে তা স্বীকার করে বলেন, এসব ক্লাসের জন্য কোনো অর্থ নেওয়া হয় না।
সাংবাদিকরা তখন প্রধান শিক্ষককে জানায়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী অর্থের বিনিময়ে হোক বা বিনামূল্যে হোক, বিদ্যালয় শুরু হওয়ার আগে এবং ছুটির পর বিদ্যালয় ভবনে কোনো ধরনের আলাদা ক্লাস বা কোচিং পরিচালনার সুযোগ নেই। এর জবাবে প্রধান শিক্ষক বিষয়টি শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানান।
পরে বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক নিজাম উদ্দিন সাংবাদিকদের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডাকেন। সেখানে অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলাকালে সহকারী শিক্ষিকা মাহমুদা আক্তার পিংকি ও অসৎ উদ্দেশ্যে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে থাকেন সাংবাদিকদের।
এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য পরিচয়ে সেখানে উপস্থিত হন। তারা সাংবাদিকদের সাংবাদিকতার পরিচয় যাচাই করেন এবং সাংবাদিকতার নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের দাবি ছিল, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রবেশের আগে এলাকাবাসীর অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন নিজেকে কাউন্সিলর প্রার্থী পরিচয়দানকারী রুবেল নামের এক ব্যক্তি প্রধান শিক্ষকের পক্ষে উপস্থিত হন। তিনি সাংবাদিকদের সাংবাদিকতার পরিচয়পত্রের ছবি তোলেন এবং উচ্চস্বরে কথা বলে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বিভিন্ন অশোভনীয় মন্তব্য করেন।
তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই সেখানে উপস্থিত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পরিচয়দানকারী কয়েকজন সদস্যের হস্তক্ষেপে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। পরে সাংবাদিকরা নিরাপদে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন।
এদিকে বিদ্যালয়ে কোচিং কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে লিখিত আবেদন পেলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে উপজেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ।
নিউজ উল্লেখিত প্রতিটি অভিযোগের সুস্পষ্ট প্রমাণস্বরূপ ভিডিও ফুটেজ ও বক্তব্য রয়েছে।
এ ঘটনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আসছে শীঘ্রই।